সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ, সপ্তগ্রাম বন্দর । Sayed Jamaluddin Mosque, Saptagram Port

সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ, সপ্তগ্রাম বন্দর । Sayed Jamaluddin Mosque, Saptagram Port
প্রায় ৮০০ বছরের পুরানো বাংলার প্রাচীন বন্দর সপ্তগ্রাম বা সাঁতগাও এর অন্যতম স্থায়ী স্থাপত্য এই সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ। যা সপ্তগ্রামের ইতিহাস এখনও বহন করে চলেছে। হাওড়া থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সপ্তগ্রাম যা আদি সপ্তগ্রাম নামে পরিচিত, বর্তমানে হুগলী জেলার অংশ। যার নামেই স্থানীয় রেল স্টেশন।

সপ্তগ্রাম বা সাঁতগাও নামে পরিচিত স্থান আসলে সাতটি গ্রাম –বাসুদেবপুর, বাঁশবেড়িয়া, খামারপাড়া, কৃষ্ণপুর, দেবানন্দপুর, শিবপুর ও ত্রিশবিঘা নিয়ে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে শুধুমাত্র ‘ত্রিশবিঘা’–ই আমাদের কাছে সপ্তগ্রাম নামে পরিচিত। সপ্তগ্রাম নামকরণের প্রচলিত একটি পৌরাণিক কাহিনী থাকলেও তা যে কতটা সত্য তার প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

সপ্তগ্রাম বন্দর ও ট্যাঁকশাল -

সপ্তগ্রাম বন্দরের উত্থানের একমাত্র কারণ হল সরস্বতী নদী। পূর্বে গঙ্গা ত্রিবেনীতে এসে তিনটি শাখায় বিভক্ত হত। তার মধ্যে সরস্বতী শাখা অর্থাৎ সরস্বতী নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল সপ্তগ্রাম বন্দর। তাম্রলিপ্ত বা তমলুক বন্দরের পর সপ্তগ্রামই ছিল বাংলার অন্যতম বন্দর। কিন্তু কালের নিয়মে সরস্বতী তার নাব্যতা হারায় বর্তমানে সরস্বতী শুধুমাত্র খালের আকার ধারণ করেছে।

সপ্তগ্রাম বন্দরের বিকাশ শুরু হয় মোটামুটি ত্রয়োদশ খ্রিষ্টাব্দে, যখন জাফর খান গাজী বাংলা আক্রমণ করে দখল করেন এবং বাংলায় ইসলাম যুগের সূচনা করেন (১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)। পরবর্তীকালে সপ্তগ্রামের শাসনভার যখন সৈয়দ ফখরুদ্দিন হাতে দিল্লীর বাদশা তখন মহম্মদ বিন তুঘলক। ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকে যাকে আমরা চিনি “খামখেয়ালি রাজা অথবা পাগলা রাজা”, যিনি কিনা দিল্লী থেকে রাজধানী দৌলতাবাদে স্থানান্তর করেন। সম্রাট বিন তুঘলক পরবর্তীকালে এই সপ্তগ্রামেই ট্যাঁকশাল তৈরি করেন এবং এই ট্যাঁকশালেই ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয় প্রথম রুপোর মুদ্রা। অর্থাৎ সেই সময়েই সপ্তগ্রামে বন্দর ব্যবসা বাণিজ্যের ঘাটি হতে আরম্ভ করে।

১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে পর্যটক ইবন বতুতা এই সপ্তগ্রাম বন্দর দিয়েই বাংলায় প্রবেশ করেন। কবি বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থেও এই সপ্তগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। পরবর্তীকালে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে সপ্তগ্রাম বন্দরেই প্রথম পর্তুগীজ জাহাজ আসতে শুরু করে। কিন্তু কালের নিয়মে সরস্বতী নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সপ্তগ্রাম বন্দর তার মূল্য হারায়। শেষ বন্দরে পর্তুগীজ জাহাজ আসে ১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালীন পর্তুগীজরা গঙ্গার তীরবর্তী হুগলী অঞ্চলে বন্দর স্থাপনের অনুমতি চাওয়ায়, আকবর নতুন বন্দরের জন্য ফারমান পেশ করেন। এইভাবেই হুগলীতে পর্তুগীজ উপনিবেশ স্থাপন হয়। ফলে ষষ্ঠদশ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতেই সপ্তগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব হারাতে থাকে।

সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ -

সৈয়দ জামালুদ্দিন কে? কেনই বা তিনি মসজিদ তৈরি করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এই মসজিদেরই দেওয়ালে এক প্রস্তরফলকে। বাংলায় প্রথম ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময়ই যে কটি মসজিদ তৈরি হয়, লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেইগুলি সবই ইঁটের তৈরি এবং পোড়ামাটির (টেরাকোটার) অলংকরণে সমৃদ্ধ। এখানে সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদও সেই পর্যায়ের। মসজিদ এর গঠন আয়তাকার।

মসজিদের কেন্দ্রস্থল দক্ষিণ-পশ্চিম দিক ও পাথরের থাম

মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে একটি মিনার, অনুমান করা যায় কোনো এক সময়ে মসজিদের চারকোনে চারটি মিনারই ছিল এবং তা মসজিদের গঠনকার্যকে আরও সৌখিন করে তুলত। মসজিদের সম্মুখে অর্থাৎ পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশদ্বার এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি করে প্রবেশদ্বার।
উত্তর-পশ্চিম কোণের মিনার

মসজিদের মেহরাব

মসজিদের ভেতরে অর্থাৎ প্রার্থনাকক্ষের পশ্চিমের দেওয়ালে রয়েছে তিনটি পোড়ামাটির অলংকরণযুক্ত মেহরাব, যা মক্কার দিক নির্দেশ করে। বর্তমানে মসজিদের কোনো ছাদ নেই, অনুমান করা যায় বহু পূর্বেই তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রার্থনাকক্ষের মধ্যিখানে দুটি পাথরের থাম লক্ষ্য করা যায়, এই রকম পাথরের থাম আগেও জাফর খান গাজী মসজিদেও দেখতে পাওয়া গেছে। মসজিদের দেওয়ালে অনেক জায়গায়ই পোড়ামাটির (টেরাকোটার) অলংকরণে সুসজ্জিত।
সৈয়দ ফখরুদ্দিন ও তার পরিবারের কবর

মসজিদ প্রতিষ্ঠার শিলালিপি

মসজিদের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে তিনটি কবর। দুপাশে দুটি পুরুষের এবং মধ্যিখানে রয়েছে একটি মহিলার কবর। কবর গুলি কার? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে, যখন গবেষক হায়েনরিখ ব্লকম্যান সপ্তগ্রামে আসেন এবং পূর্বদিকের দেওয়ালের শিলালিপির তর্জমা করেন। শিলালিপিতে বলা হয়েছে – ৯৩৬ হিজরি (মে, ১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে) রামজান মাসে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর পুত্র সুলতান আবুল মুজফ্ফর নসরত শাহ এর রাজত্বকালীন আমুল থেকে আগত সৈয়দ ফখরুদ্দিন হুসেন এর পুত্র সৈয়দ জামালুদ্দিন হুসেন মসজিদটি নির্মাণ করেন। কবর এর একটি সৈয়দ ফখরুদ্দিন এর অর্থাৎ সৈয়দ জামালুদ্দিন এর বাবার, দ্বিতীয়টি জামালুদ্দিনের মায়ের এবং তৃতীয়টি তাদের খোজার অর্থাৎ গুরুর। এছাড়াও কবর এর সামনে রয়েছে আরও তিনটি শিলালিপির খন্ড। যদিও ব্লকম্যানের মতে তা এই মসজিদের অংশ নয়।
টেরাকোটার অলংকরণ
টেরাকোটার অলংকরণ

শিলালিপি থেকেই অনুমান করা যায় কোনো এক সময়ে সৈয়দ ফখরুদ্দিন আমুল থেকে (যার বর্তমান নাম তুর্কমেনিস্থান) এই বাংলায় সপ্তগ্রাম বন্দরেই এসে বসবাস শুরু করেন। বাংলায় মুসলিম শাসনকালের সময় যে অনেক ইসলাম ধর্মলম্বনকারীরা বাংলায় আসতে শুরু করেন তার একটি উদাহরণ এই মসজিদ। তাই বাংলার অন্যান্য মসজিদের মত সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ শুধুমাত্র মসজিদ নয় বাংলার বন্দরের ইতিহাসে সপ্তগ্রাম কে তুলে ধরা একমাত্র স্থায়ী স্থাপত্য।

গাছের আড়ালে মসজিদ ও কবর

******************************************************

লেখা, গবেষণা ও ছবি - প্রীতম নস্কর  

ই-মেল - pritamnaskar.pn@gmail.com

ব্লগটি ভালো লেগে থাকলে ব্লগের লিঙ্ক শেয়ার করতে পারেন, তবে পূর্বানুমতি ছাড়া আমার তোলা আলোকচিত্রগুলি এবং ব্লগের রচনাগুলি অন্য কোথাও কপি-পেস্ট বা বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার করা চলবে না।

******************************************************

কীভাবে যাবেনঃ-

হাওড়া থেকে মেনলাইনগামী বর্ধমান যাওয়ার যে কোন ট্রেন এ উঠে নামতে হবে আদি সপ্তগ্রাম স্টেশন। সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। স্টেশনে নেমে মসজিদে যাওয়ার অনেক টোটো পেয়ে যাবেন, সময় লাগবে ৫ মিনিট। আর স্টেশন থেকে হেঁটে গেলে সময় লাগবে প্রায় ২০ মিনিট।

কী খাবেনঃ-

মসজিদের সামনে সেরকম কোনো খাবারের দোকান নেই। তবে সামনেই স্টেশনের দিকে আসতে গেলে অনেক ফাস্টফুডের দোকান পাওয়া যাবে।

তথ্যসূত্রঃ-

  • History of Bengal Vol.2 – Jadu Nath Sarkar
  • বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খন্ড) (মধ্যযুগ)  শ্রীরমেশ্চন্দ্র মজুমদার
  • হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ - সুধীরকুমার মিত্র

Comments